
শায়রুল কবির খান : দেশের জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাধারার কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে, এগুলোই প্রধান শক্তি। এর বিপরীতে বিকল্প রাজনৈতিক চর্চা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে অতীতের মতো নানাভাবে চেষ্টা হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতির প্রধান প্রতিনিধি হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। দলটির রাজনৈতিক দর্শন আছে; বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এর একটি কারণ বিএনপির জন্মই হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে মুসলিম লীগ থেকে; মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ হয়ে আওয়ামী লীগ, তারপর বাকশাল হয়ে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে; আবার সেই মুসলিম লীগ থেকে জন্ম হওয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে। সেদিক থেকে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাম ও কর্মসূচি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাগরিকদের যে জাতিসত্তা প্রয়োজন, সেই কর্মসূচি তারা দিতে পারেনি বা দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। বর্তমানে বা আগামী সময়ে দেওয়ার সুযোগ আছে বলেও মনে হয় না।
রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচির প্রশ্নে যদি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তুলনা করি; দুই দলেরই ছিল তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক ভিত্তি; এক দল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিয়েছে, আরেক দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারেনি। তাহলে এভাবে বলা যায়, বিএনপির রয়েছে তিনটি শক্তি আর তার বিপরীতে আওয়ামী লীগের দুটি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলাম। দলটির ইতিহাসে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের যখন যার সঙ্গে যেভাবে চলা দরকার, সেভাবে মিশে গিয়ে চলতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিলম্বিত উপলব্ধির মধ্য দিয়ে গঠনতন্ত্রে বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে চায়নি। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ গ্রন্থে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতে ইসলামীকে কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামীর রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপির কি জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী কৌশলে মোকাবিলা করা উচিত, নাকি ভিন্নভাবে?
আওয়ামী লীগের মতো একটি সংগঠনকে মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পাওয়ার দুর্ভাগ্য বিএনপিকে আজন্ম বয়ে বেড়াতে হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি যদি মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি ধাঁচেরই আরেকটি রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় ভূমিকায় পেত, তবে তা সবার জন্যই কল্যাণকর হতো।
যা-ই হোক, এখন বিএনপি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী নবীন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে কতটা মোকাবিলা করতে পারছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরে খানিকটা বোঝা গেছে। কাজটি বিএনপি কতটা পারদর্শিতার সঙ্গে করেছে– তা যদি এখনই সঠিকভাবে অনুধাবন করা না যায়, বড় দেরি হয়ে যাবে।
লক্ষণীয়, জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলার কৌশল হিসেবে বিএনপির প্রধান ইস্যু এখনও মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু জামায়াতে ইসলামীর নাজুক জায়গা, সন্দেহের অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনা মর্মমূলে গ্রোথিত, তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া কি জামায়াতে ইসলামীর আর কোনো নাজুক জায়গা নেই? জামায়াতের রাজনীতি কি এতটাই সরল যে, মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া দলটিকে মোকাবিলার বিকল্প ইস্যু নেই? উত্তর হচ্ছে– অবশ্যই আছে। সর্বদা সুবিধাবাদী ও ভ্রান্ত রাজনৈতিক অবস্থান, গুজব ছড়ানোর কাঁচা কৌশল হলো জামায়াতের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশে একাত্তরের দুর্বলতা কাঁধে নিয়েই রাজনীতি করে যাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতার স্বাদও পেয়েছে। পরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতকে কঠিন বেকায়দায় পড়তে হলেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এসেছিল তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে। এতে করে দলটি যেন ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক চাবিকাঠি হাতে পেয়ে গেছে। শেখ হাসিনার অপরিণামদর্শী কৌশলের কারণে জামায়াত এখন চারাগাছ থেকে বড় বৃক্ষে পরিণত হতে চাইছে; আগের মতো বোতলবন্দি হয়ে থাকতে আর রাজি নয়।
এই দফায় জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে দুজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। জোটসঙ্গী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে পেয়েছে। আর সরাসরি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। এতে করে বোঝা যাচ্ছে, দলটি সামনের দিনে সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে চায়, কেবল বিএনপির ভুলের অপেক্ষা করছে।
বিএনপিকে সেই ভুল করা যাবে না। রাজনীতির নতুন বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ যেমন শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু সামনে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা করতে চেয়েছে, বিএনপি সেই পথে গেলে ভুল করবে।
বিএনপি নিশ্চয়ই ইতিহাসের সব সত্য সামনে এনে মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্ব সমুন্নত রাখবে। আওয়ামী লীগ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করতে চেয়েছে, সেটা বিএনপি করবে না। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যান্য ইস্যুও সামনে আনতে হবে। বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতেই রয়েছে তার পথরেখা।
শায়রুল কবির খান: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৪০ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৬:৫৫ |
| যোহর | দুপুর ১২:৪৪ |
| আছর | বিকাল ৪:০৫ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:৩৩ |
| এশা | রাত ৭:৪৯ |