
স্টাফ রিপোর্টার: চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল’ (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ (DP World)-এর হাতে ইজারা
দিলে বছরে আর্থিক ক্ষতি হবে ৯২ মিলিয়ন ডলার।জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আজ ৩০ সেপ্টেম্বর(২০২৬) বুধবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ (রিসার্চ উইং)-এর উদ্যোগে আয়োজিত “ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা চেষ্টা: নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা” শীর্ষক এক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক, আইনজীবী, নাগরিক সমাজ ও ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিরা এমন মন্তব্য করেছেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক। গোলটেবিল বৈঠকে সংগঠনের লিখিত গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সদস্য সচিব শাহাদাত ফরাজী সাকিব।আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন নৌবাহিনীর সাবেক সহকারি প্রধান ও বিইউপির প্রো-ভিসি (সাবেক)- কমোডর জসীমউদ্দীন, জনতার দলের মুখপাত্র মেজর (অব:) ডেল এইচ খান, দৈনিক ইনকিলাবের সহকারি সম্পাদক ও পার্বত্য নিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, আমরা বাংলাদেশী’র সমন্বয়ক মমিনুল আমীন, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী এডভোকেট সোমাইয়াদ শাহেরিয়া ফিদা,স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মুখপাত্র মুহিউদ্দিন রাহাত, জনজোট বিপ্লবী পার্টির মুখপাত্র মোজাম্মেল মিয়াজী ও বাংলাদেশ মঞ্চের আহব্বায়ক ফুয়াদ সাকি প্রমুখ।
গবেষণা প্রবন্ধে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলে ধরে সভরেন্টির গবেষক দল বলেন, “এই অসম ও আত্মঘাতী চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দেশের উদীয়মান পোর্ট অপারেটিং ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হবে।দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি থেকে বছরে নিট আয় হয় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত মডেলে বন্দরের সমস্ত প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর পর নিট আয় দাঁড়াবে মাত্র ৫৬.৩ মিলিয়ন ডলারে।ফলে প্রতি বছর দেশ সরাসরি প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার (হাজার কোটি টাকার বেশি) রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।এছাড়া ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুবাইয়ে শেখ হাসিনার সাবেক জামাতার অর্থপাচারের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অংশ হিসেবে এনসিটি তুলে দেওয়ার অপতৎপরতা শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সময়েও রহস্যজনকভাবে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান তথ্যগুলো হলো:
১) সক্ষমতা কমার ঝুঁকি: জার্মান প্রতিষ্ঠান এইচপিসির প্রাক্কলন ছাড়িয়ে দেশীয় অপারেটররা যেখানে বছরে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ৪ বছর পরের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টিইইউ।
২) ভারতীয় প্রভাব ও জাতীয় নিরাপত্তা: ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ সিইও যুবরাজ নারায়ণ, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার অনিল মোহতা, গ্লোবাল চীফ অপারেটিং অফিসার গণেশ রাজ, গ্রুপ টেকনোলজি অফিসার প্রদীপ দেশাই এবং ভারতীয় উপমহাদেশের এমডি রিজওয়ান সুমার সহ কেন্দ্রীয় ম্যানেজমেন্টের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭ জন ই ভারতীয় নাগরিক। ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর পরিচালনাকারী ব্যক্তিরাই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রযুক্তিগত ডেটাবেজ ও পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করলে তা চরম ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) তৈরি করবে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কৌশলগত নাশকতার (Sabotage) পথ খুলে দেবে।
৩)ভূ-রাজনৈতিক ও ফিডার ভেসেল চক্রান্ত: ডিপি ওয়ার্ল্ড ভারত-ইসরায়েল-আমিরাত-আমেরিকা অক্ষের ‘আইমেক (IMEC) করিডোর’-এর লজিস্টিক অংশীদার। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ’ করিডোর বানচাল করা এবং বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ‘রিজিওনাল হাব’ হতে না দিয়ে ভারতের অধীনস্থ কেবল একটি ‘ফিডার পোর্ট’ বানিয়ে রাখার গভীর ভূ-রাজনৈতিক নীলনকশা চলছে।
৪)দেশে দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও বিতর্কিত কার্যক্রম: জিবুতি, সোমালিয়া, সোমালিল্যান্ড ও ইউক্রেনে ডিপি ওয়ার্ল্ড বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনাল ইজারা নেওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিচ্ছিন্নতাবাদে মদদ ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণের তিক্ত ইতিহাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থানের সন্নিকটে এমন বিদেশি সংস্থাকে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দেওয়া দেশের অখণ্ডতার জন্য চরম আত্মঘাতী।
গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক সহকারি প্রধান ও বিইউপির সাবেক প্রো-ভিসি কমোডর জসীমউদ্দীন ১৬৬১ সালে ব্রিটেনের সাথে ম্যারেজ ট্রিটির মাধ্যমে বোম্বে বন্দর মাত্র ১০ পাউন্ডে ইজারা দেওয়ার ফলে দীর্ঘ ২০০ বছরের ব্রিটিশ পরাধীনতা নেমে আসার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক শোষণের ইতিহাস আমরা দেখেছি। আজ ডিপি ওয়ার্ল্ড সাদা চামড়ার বদলে নব্য-উপনিবেশের হাতিয়ার হয়ে ঢুকতে চাইছে। আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।”
দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, “জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লোকসান দিয়েও আমরা যেমন জরুরি প্রয়োজনে টিকিয়ে রাখি, তেমনি যুদ্ধ বা বড় দুর্যোগকালে বিদেশি অপারেটররা ব্যবসা ফেলে পালিয়ে গেলে পুরো দেশের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে। তাই দেশের নিজস্ব সম্পূর্ণ তৈরি এনসিটি বন্দরকে কোনো অবস্থাতেই বিদেশি লিজ দেওয়া যাবে না।”
জাতীয় স্বার্থে গোলটেবিল বৈঠকে ৩ দফা দাবি তুলে ধরেন:
১)ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার অসম ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
২) লাভজনক ও প্রস্তুত কোনো রাষ্ট্রীয় টার্মিনাল বিদেশিদের কনসেশনে না দিয়ে শতভাগ দেশীয় অপারেটরদের দ্বারা পরিচালনা করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সেটা রাষ্ট্রীয় কিংবা বেসরকারি যেটাই হোক বাংলাদেশী অপারেটরদের দিয়েই পরিচালনা করতে হবে।
৩)চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল লিজ প্রক্রিয়ার আওয়ামী লীগ ও অন্তবর্তী সরকারের এই পাপের বোঝা যেন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত বিএনপি সরকার গায়ে না মাখে,সেজন্য লিজ প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে।
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৩৫ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৬:৫০ |
| যোহর | দুপুর ১২:৪৮ |
| আছর | বিকাল ৪:১৩ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:৪৭ |
| এশা | রাত ৮:০২ |