
নিজস্ব প্রতিবেদক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশযাত্রা ও দেশে ফেরার সময় সহায়তার জন্য স্থাপন করা হয়েছিল একটি বিশেষ ‘কল্যাণ ডেস্ক’। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ—প্রজাতন্ত্রের অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিমানবন্দর ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া।
কিন্তু বাস্তব চিত্র কতটা ভিন্ন?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই ডেস্ক তৈরি, গত এক বছরে তাদেরই দেখা মেলেনি সেবাপ্রার্থী হিসেবে। নেই নিয়মিত প্রটোকল কার্যক্রম। নেই প্রত্যাশিত ব্যস্ততা। অথচ জনবল আছে, জায়গা আছে, অবকাঠামো আছে—আছে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ব্যবস্থাও।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যাদের সেবা দেওয়ার জন্য এই ডেস্ক, তারা যদি সেবাই না নেন, তাহলে কার জন্য এই আয়োজন?
এক বছরে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সেবা কতজন?
টার্মিনাল-১-এর ১ নম্বর গেটের দ্বিতীয় তলায় স্থাপিত এই ডেস্ক পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যা ডেস্কটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
ডেস্কে কর্মরত দুই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে কোনো অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখান থেকে নিয়মিত প্রটোকল বা বিশেষ সহায়তা নিয়েছেন—এমন ঘটনা তাদের জানা নেই।
শুধু তাই নয়, ডেস্কের রেজিস্টারেও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের উপস্থিতি খুবই সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
তাহলে প্রশ্ন—সেবাপ্রার্থী কোথায়?
যে শ্রেণির মানুষের কথা মাথায় রেখে পৃথক ডেস্ক, জনবল ও অবকাঠামো তৈরি করা হলো, তারা যদি সেখানে না আসেন, তাহলে উদ্যোগটির প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তব কার্যকারিতা কি কখনো মূল্যায়ন করা হয়েছে?
‘আমাদের কোনো প্রটোকল নেই’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন,
“আমাদের কোনো প্রটোকল নেই। আমাদের কখনো কোথাও যেতে হয় না। কাজ না থাকলে ভালো লাগে না। শুধু অপেক্ষা করা আর সময় পার করা—এভাবেই দিন কাটে।”
আরেকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, তারা বোর্ডিং পর্যন্ত যাত্রীকে সহায়তা করতে পারলেও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ডিউটি পাস বা প্রবেশাধিকার না থাকায় কার্যকর প্রটোকল সেবা দেওয়া কঠিন।
অর্থাৎ নামেই প্রটোকল, বাস্তবে সীমিত কার্যক্রম—এমন অভিযোগই উঠে এসেছে।
কারা পাচ্ছেন সেবা?
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সেবাগ্রহীতাদের পরিচয় নিয়ে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকৃত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিমানবন্দর-সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীন ও নথিভিত্তিক যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে তা শুধু একটি ডেস্কের কার্যক্রম নয়, সরকারি সম্পদ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করবে।
তাই সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি—গত এক বছরের সব সেবা রেজিস্টার, আবেদনপত্র, অনুমোদন, প্রটোকল তালিকা ও প্রবেশপাসের তথ্য প্রকাশ করা হোক।
তাহলেই স্পষ্ট হবে—ডেস্কটি আসলে কার সেবা দিয়েছে?
কোটি টাকার আয়োজন, সেবা কোথায়?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই ডেস্কের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ এক কোটি টাকারও বেশি।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কোন খাতে খরচ হয়েছে?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডেস্কে প্রত্যাশিত সেবা কার্যক্রম না থাকলেও বিভিন্ন বিল-ভাউচার ও স্লিপের মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সরকারি বাজেট, অনুমোদনপত্র, বিল-ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি ও অডিট প্রতিবেদন।
এসব নথি প্রকাশ করা হলে একদিকে যেমন প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র বেরিয়ে আসবে, অন্যদিকে ডেস্কটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতাও স্পষ্ট হবে।
একই বিমানবন্দরে রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইতোমধ্যে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অধীনে রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। বিদেশগামী ও প্রত্যাগত কর্মীদের বিমানবন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ডেস্কের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জনবল রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—যদি বিমানবন্দরে প্রটোকল ও যাত্রী সহায়তার জন্য বিদ্যমান কাঠামোই থাকে, তাহলে একই ধরনের কাজের জন্য আলাদা আরেকটি কাঠামো কতটা যৌক্তিক?
তাদের প্রস্তাব, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পরিচালিত ডেস্কটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে বিদ্যমান প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।
এতে আলাদা অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয় কমার পাশাপাশি জনবলকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
‘কাজ নেই’—তবু জনবল কেন?
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনবল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই জনবলের দায়িত্ব, কাজের পরিমাণ এবং ফলাফলও পরিমাপযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—
দিনে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী সেবা নিচ্ছেন?
মাসে কতটি প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে?
কতজন কর্মরত কর্মকর্তা সেবা নিয়েছেন?
কতজন পিআরএলভোগী সেবা নিয়েছেন?
কতজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেবা নিয়েছেন?
কতজনকে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে সহায়তা দেওয়া হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কোনো নিয়মিত প্রতিবেদনে সংরক্ষণ করা হয়?
যদি হয়, সেই তথ্য প্রকাশে বাধা কোথায়?
উদ্যোগটি অপ্রয়োজনীয়—নাকি ব্যবস্থাপনাই অকার্যকর?
এখানে দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
প্রথমত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিমানবন্দরে বিশেষ সহায়তার বাস্তব প্রয়োজন থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সেই প্রয়োজন পূরণের জন্য যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর—সেটিও পরিমাপ করা জরুরি।
যদি সেবাপ্রার্থী না আসে, তাহলে কারণ খুঁজতে হবে।
সেবা সম্পর্কে কর্মকর্তারা জানেন না?
আবেদনপ্রক্রিয়া জটিল?
প্রটোকল দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় পাস বা প্রবেশাধিকার নেই?
নাকি বাস্তবেই এমন কোনো উল্লেখযোগ্য চাহিদা নেই, যার জন্য পৃথক ডেস্ক প্রয়োজন?
প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু ডেস্ক চালিয়ে যাওয়া হলে সরকারি অর্থ ও জনবলের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে কীভাবে?
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে—
– ডেস্ক স্থাপনের প্রস্তাব ও অনুমোদন;
– প্রকল্প/বরাদ্দের পরিমাণ;
– গত এক বছরের মোট ব্যয়;
– বিল-ভাউচার ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি;
– কর্মরত জনবলের সংখ্যা ও দায়িত্ব;
– ডিউটি রোস্টার;
– সেবা গ্রহণকারীদের রেজিস্টার;
– গত এক বছরে দেওয়া প্রটোকলের সংখ্যা;
– পিআরএল ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেবা গ্রহণের তথ্য;
– বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রবেশপাস/ডিউটি পাসের তথ্য;
– এবং অডিট আপত্তি থাকলে তার বিবরণ—
এসব নথি যাচাই করা জরুরি।
কারণ সরকারি অর্থে স্থাপিত কোনো সেবা কেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেবাটি আসলে কতজন মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্যোগটি সত্যিকার অর্থে কতটা জনকল্যাণ করছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু যদি বাস্তবতা হয়—সেবাপ্রার্থী নেই, প্রটোকল নেই, প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নেই, জনবল কার্যত বসে আছে এবং কোটি টাকার বরাদ্দের কার্যকারিতাও স্পষ্ট নয়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
শাহজালালের এই কল্যাণ ডেস্ক কি সত্যিই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে কাজ করছে, নাকি এটি পরিণত হয়েছে আরেকটি অকার্যকর সরকারি কাঠামোয়?
উত্তরটি কথায় নয়—নথি, পরিসংখ্যান, রেজিস্টার ও অডিটেই পাওয়া সম্ভব।
এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করে কি না।
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৩৩ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৬:৪৮ |
| যোহর | দুপুর ১২:৫০ |
| আছর | বিকাল ৪:১৫ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:৫২ |
| এশা | রাত ৮:০৭ |