
মনির হোসেন জীবন : রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ইদানিংকালে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ মাদক ইয়াবা ট্যাবলেট। এ মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মাদক কারবারিদের মাঝে নেশার জগতে নতুন করে অভিনব এক প্রতারণা শুরু হয়েছে । দেশে ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল “মায়াবড়ি”। শহর থেকে শুরু করে বর্তমানে দেশের হাঁট বাজারে ১/২ টাকা দামের ওষুধের গায়ে মার্কার বা সাইনপেন দিয়ে লাল-গোলাপি রঙ করে ইয়াবা হিসেবে বিক্রি করছে এক অসাধু চক্র। এ পেশায় এক শ্রেণির অসাধু সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র জড়িত রয়েছে। প্রতিটি ট্যাবলেট তারা বিক্রি করছেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। চিকিৎসকদের মতে- এ ধরনের ওষুধ অতিরিক্ত পরিমাণে সেবনকরলে স্বাস্থ্যের জন্য মানবদেহে ভয়াবহ ক্ষতিকর হবার অধিক সম্ভাবনা আছে । জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, স্তন ফুলে যাওয়া, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও পুরুষত্বহীনতায় ভোগার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের নিকটবর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারে তৈরি হওয়া এই মাদকদ্রব্যটি চোরাচালান হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে মরননেশা মাদক ইয়াবা। ২০০২ সালে প্রথম দিকে বাংলাদেশে এই নেশা শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। এরপরও বন্ধ কেন হচ্ছে না মাদক বেচাকেনা। এর পেছনে কারা জড়িত; কি তাদের আসল পরিচয়!
এদিকে রাজধানীতে মদ, গাঁজা, ইয়াবা ট্যাবলেটসহ নেশা জাতীয় দ্রব্য ঠেকাতে চলছে পুলিশ, এপিবিএন পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান। এই অভিযানের মুখে আসল ইয়াবার জোগান কমে গেছে। ফলে নেশার জগতে বাজারে শুরু হয়েছে অভিনব এক প্রতারণা। দেশের নেশাগ্রস্ত যুবকদের মতে- “মরন নেশা ইয়াবা খাবি খা, ভুগতে ভুগতে একদিন মারা যাবি যা”। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক তথ্য সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের।
তথ্য অনুসন্ধান ও বিভিন্ন প্রাপ্ত সুত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা নগরীসহ আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন স্পটে কৌশলে এই ভুয়া ইয়াবা ট্যাবলেট দেদাচ্ছেন দিবারাত্রি বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে । দেখতে ইয়াবার মতো হুবহু চেহারা, মূলত জন্মনিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেট ‘মায়াবড়ি’ ও কোষ্ঠ কাঠিন্যের ওষুধ ‘ডুরালাক্স’ ব্যবহার করছে চক্রটি। কম দামে বা সংকটের সময়ে মাদক পাওয়ার প্রলোভনে আসা তরুণ, যুবক- যুবতীরাই মূলত অহরহ এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ভুয়া এই মাদক সেবন করে অনেকেই মারাত্মক শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন এবং ভুগছেন।
রাজধানী তুরাগের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা । মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতন থেকে বাঁচতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে তুলে দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কোথাও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ ও মাদক বিরোধী সভা সমাবেশ করছেন, কোথাও ঘটছে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাদক বিরোধী অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি কিছুতেই থামছে না।
ভুক্তভোগী, এলাকাবাসী ও মাদকে আসক্ত পরিবার গুলোর (তাদের) ভাষ্য, অনেক পরিবারের উচ্চশিক্ষিত ছেলে- মেয়েদের মধ্যে অনেকেই দিনদিন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন। মাদক কেনার টাকা না দিলে তারা মা-বাবাকে মারধর করেন এবং দ্য-চাকু নিয়ে ভয় দেখান। এ অবস্থায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পরিবার নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ—কিছু এলাকায় মাদক বিক্রি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়; নির্দিষ্ট কিছু স্পট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও মাদক কারবার প্রকাশ্যে চলছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে সরবরাহ এবং বাসাবাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মাদকসেবী এ প্রতিবেদককে জানান, ঘন ঘন অভিযানের ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই ইয়াবা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। এ সংকটে তারা প্রতিনিয়ত মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন। তারা রাতের অন্ধকারে আসল ইয়াবা ট্যাবলেট বলে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও ডুরালাক্স ঢুকিয়ে দিচ্ছেন হাতে-প্যাকেটে। এসব সেবন করার পর তার ঘন ঘন টয়লেট যেতে হচ্ছে। এমন অভিযোগ ও রয়েছে।
এ ধরনের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর বলে জানিয়েছে দেশের চিকিৎসকরা। ডাক্তারদের মতে- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং অপ্রয়োজনে এসব ওষুধ সেবনে শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরও বলেন, কোনো পুরুষ যদি নিয়মিত এই ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ খায়, তাহলে তার হরমোনের ভারসাম্য হীনতা, স্তন ফুলে যাওয়া, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও পুরুষত্বহীনতায় ভোগার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অভিযানের কারণে আসল মাদকের অভাব তৈরি হওয়ায় চক্রগুলো এই অপকৌশল বেছে নিয়েছে। এই ধরনের অপরাধ আরও নতুন নতুন অপরাধ তৈরির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে সমাজের অবক্ষয় তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তখন দেখা যায়, যুবসমাজ কর্মমুখী চিন্তা বাদ দিয়ে, সহজ উপায়ে ও অসাধু পথে অর্থ উপার্জনের দিকে পা বাড়ায়।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে মহানগর পুলিশ মাদক বিক্রির আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেসব জায়গা থেকে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ইয়াবার আদলে ‘মায়া বড়ি’ ও ‘ডুরালাক্স’ বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। এছাড়া, বিষয়টি দ্রুতই তদন্ত করা হবে বলে নিশ্চিত করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এবিষয়ে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ব্যাটালিয়ন- উত্তরা-১, এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক (অপস্ এবং মিডিয়া অফিসার) শাহ আলম জানান, গত ০১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত সর্বমোট ৮৯৫ টি অভিযান পরিচালনা করে সর্বমোট ১০৬৭ জন আসামিকে গ্রেফতারসহ ১.৯ কেজি হেরোইন, ৫৫,৪৭০ পিস ইয়াবা, ১,০৩৪ কেজি গাঁজা, ১০,২৯৩ লিটার দেশী/বিদেশী মদ, ৫৪৩ লিটার বিয়ার এবং ২৬ টি দেশী/বিদেশী অস্ত্র ও ৩২৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
এব্যাপারে দেশবাসী ও যুবসমাজকে ভয়াবহ মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই সময়। তাই বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ডিজি, ডিএমপি কমিশনার, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন নগরবাসী ও দেশের সর্বস্তরের জনগণ।
####
রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৩৬ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৬:৫১ |
| যোহর | দুপুর ১২:৪৭ |
| আছর | বিকাল ৪:১০ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:৪৩ |
| এশা | রাত ৭:৫৮ |