
আগামী ৫ বছরে জিডিপিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার উপযোগী করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)-এর প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ‘Academia–Industry Collaboration’ শীর্ষক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বর্তমান সরকার বিশেষকরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতির দেশে পরিণত করা। সরকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতি গঠনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিকস, অটোমেশন, ডেটা সায়েন্স ও ন্যানোটেকনোলজির মতো আধুনিক ও যুগোপযোগী বিষয়ে বিভাগ চালু করা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ কিংবা বক্তব্য প্রদানের মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং দৃশ্যমান ও বাস্তবমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায়। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করাই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং দক্ষ উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সরকারের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে মোট ৮০০ কোটি টাকার উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দের প্রস্তাব এবং আরও ৫০০ কোটি টাকা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) খাত থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তব ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তর এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মামুন বলেন, সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিবছর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
স্মার্ট এআই সিটি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নগর ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। স্মার্ট এআই সিটির ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), বিগ ডেটা এবং আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামোর সমন্বয় প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নগর ব্যবস্থাপনা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক সেবাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করা সম্ভব।
ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের বিবেচনাধীন ‘One Teacher, One Tab’ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি ও ব্যবহারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট ও আধুনিক ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য বর্তমান সরকার আগামী দুই বছরের মধ্যে ৯০% এলাকায় ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্মার্ট সেবা ভবিষ্যতের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে পারে।
প্রযুক্তিপণ্যের সহজলভ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নির্বাচিত তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর করহার হ্রাস ও কর-সুবিধার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবহার সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, কর-সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এবং সরকারের নীতিগত সহায়তার সমন্বয়ে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পাঠদান ও সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এবং GoPlane Limited-এর মধ্যে একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আয়োজন করা হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলী। এ ছাড়া GoPlane Limited-এর পরিচালক মো. রইসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা আসিফ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ | |
| ওয়াক্ত | সময় |
|---|---|
| সুবহে সাদিক | ভোর ৫:৪৭ |
| সূর্যোদয় | ভোর ৭:০৩ |
| যোহর | দুপুর ১২:৪২ |
| আছর | বিকাল ৩:৫৬ |
| মাগরিব | সন্ধ্যা ৬:২০ |
| এশা | রাত ৭:৩৭ |